বৃহস্পতিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ০১:২৮ পূর্বাহ্ন
শিরোনামঃ
ইরানি সংস্কৃতিতে আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন, বললেন খামেনি রেলপথে ৩৪০ দিনে ১ হাজার ৫৩৫ দুর্ঘটনায় নিহত ২৬১ প্রধানমন্ত্রীর নতুন মুখ্য সচিব তোফাজ্জেল হোসেন মিয়া অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য সমুদ্র নিরাপদ রাখতে কাজ করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী বিএনপি পল্টনেই কেন সমাবেশ করতে চায়, খতিয়ে দেখা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কক্সবাজারের মানুষ আমার হৃদয়ে আছে : প্রধানমন্ত্রী এলএনজি সরবরাহে আগ্রহী ইতালি বিএনপি অফিসে লাঠি-ককটেলের খবরে অভিযানে যায় পুলিশ: ডিএমপি কমিশনার ২০২৪ সালের প্রথম সপ্তাহে নির্বাচন, নৌকা মার্কায় ভোট চাই : প্রধানমন্ত্রী ভোলায় প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘরে পাল্টে গেছে ভূমিহীনদের জীবন

অজ্ঞতা,অসচেতনতায় বাড়ছে থাইরয়েডে

সাইদুল ইসলাম মন্টু (বিশেষ প্রতিবেদক):
  • আপলোডের সময় : সোমবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২২
  • ৩৯ বার পঠিত
অবসাদ, বিষণ্নতা, ভুলে যাওয়া রোগের নাম ‘থাইরয়েড’। বিশ্বব্যাপী ৭৫ কোটি মানুষ এ সমস্যায় ভোগে। আর বাংলাদেশে প্রায় ৫ কোটি মানুষ থাইরয়েড সমস্যায় আক্রান্ত। থাইরয়েড হরমোনের স্বল্পতা বা আধিক্য, দুই-ই শরীরের জন্য ক্ষতিকর। বুধবার (২৫ মে) ছিল বিশ্ব থাইরয়েড দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য- ‘থাইরয়েড ও যোগাযোগ’। থাইরয়েডে আক্রান্ত রোগীদের সমস্যার নানা তথ্য তুলে ধরে এ ব্যাপারে সচেতনতা ও সতর্কতা বাড়াতে ২০০৯ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী ঘটা করেই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। থাইরয়েড সমস্যা সাধারণত দু’ধরনের। হাইপারথাইরয়েডিজম ও হাইপোথাইরয়েডিজম। থাইরয়েড গ্রন্থিতে অতিরিক্ত হরমোন তৈরি হলে তাকে হাইপারথাইরয়েডিজম বলে। আর পর্যাপ্ত হরমোন তৈরি হলে তাকে হাইপোথাইরয়েডিজম বলে।
নাট্যকর্মী ও সমাজকর্মী আসমা আক্তার লিজা (৩৮)। তিনি নাট্যচর্চার পাশাপাশি মানুষের জন্য দিন-রাত সেবামূলক কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু থাইরয়েড সমস্যার কারণে প্রায়ই তার শরীরের ওজন কমে যাওয়া, চুল পড়ে যাওয়া, অনিদ্রা, অনিয়মিত ঋতুস্রাব, অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়া, প্রয়োজনীয় কথা ও কাজ তাৎক্ষণিক মনে থাকে না, শরীরে অস্থির ভাব থাকে, তৎক্ষণিত রেগে যান আবার কান্নাও করেন। শুধু তাই নয়, থাইরয়েডজনিত সমস্যার কারণ মাতৃত্বজনিত বিভিন্নি জটলিতায় ভেগেন, দু’বার তার গর্ভের সন্তান জন্মের পর মৃত্যুবরণ করে। এবং চিকিৎকরা বলেছেন এ পর্যায়ে গর্ভধারণ করে সন্তান জন্ম দেয়া তার জীবনের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ। ১৫ বছর বয়সে এই সমস্যা শনাক্তের পর থেকে লিজা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ৩ মাস অথবা ৬ মাস পর থাইরয়েডের মাত্রা পরীক্ষা করে নির্দিষ্ট মাত্রার অষুধ খেয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। থাইরয়েড সমস্যা দু’ধরনের- হাইপারথাইরয়েডিজম ও হাইপোথাইরয়েডিজম। এই হরমোনজনিত সমস্যা পুরুষদের তুলনায় নারীর প্রায় ১০ গুণ বেশি।
বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটি সহ-সভাপতি এবং বারডেম হাসপাতাল এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের অধ্যাপক এস এম আশরাফুজ্জামান জানান, সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও ধারণা করা হচ্ছে লিজার মতোই দেশের ৩০ শতাংশ মানুষ থাইরয়েড সমস্যা নিয়ে জীবনযাপন করছেন। এই রোগটি সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাবে সমস্যা আক্রান্তরা সহজে চিকিৎসকের কাছে যান না। প্রতিক্রিয়াটা ধীরে ধীরে হয় বলে প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি থাইরয়েডের রোগী পরীক্ষার বাইরেই থেকে যায়। এতে রোগের রোগটির লক্ষণ সম্পর্কে ব্যাপক প্রচার ও জনসচেতনতা বাড়ানোর জরুরি বলে মনেন তিনি। মাতৃগর্ভ থেকেই শিশুর থাইরয়েড গ্রন্থি তৈরি হয়। যদি মাতৃগর্ভে শিশুর থাইরয়েড গ্রন্থি সঠিকভাবে তৈরি না হয়, তাহলে ওই শিশুর শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা নিয়েই জন্ম হয়। এজন্য গর্ভধারণের আগেই থাইরয়েড সমস্যা পরীক্ষা করা দরকার। পরিণত বয়সেও এ রোগের প্রকোপ যথেষ্ট আছে। থাইরয়েড শরীরের এক বিশেষ গ্রন্থি। এটি স্বরযন্ত্রের দু’পাশে থাকে।
থাইরয়েড গ্রন্থি দেখতে প্রজাপতির মতো। থাইরয়েড গ্রন্থির কাজ হলো শরীরের অত্যাবশ্যকীয় থাইরয়েড হরমোন উৎপাদন করা। শরীরের জন্য থাইরয়েড হরমোনের একটি নির্দিষ্ট মাত্রা আছে। নির্দিষ্ট মাত্রার চেয়ে কম বা বেশি হরমোন উৎপাদিত হলেই শরীরে ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে শুরু করে। থাইরয়েড হরমোন কম উৎপন্ন হলে বলা হয় হাইপোথাইরয়েডিজম ও বেশি উৎপন্ন হলে বলা হয় হাইপারথাইরয়েডিজম। নারী-পুরুষ উভয়ই থাইরয়েড সমস্যায় ভুগতে পারেন। বিভিন্ন সমীক্ষয় দেখা গেছে, প্রতি এক হাজার নারীর মধ্যে অন্তত ১৫ জন ও এক হাজার পুরুষের মধ্যে ১ জন ব্যক্তি থাইরয়েডের সমস্যায় আক্রান্ত। এদের অর্ধেকের বেশিই জানে না, তারা থাইরয়েড সমস্যায় ভুগছে। প্রাপ্ত বয়স্ক নারীদের প্রায় ২ শতাংশ এবং পুরুষদের প্রায় শূন্য দশমিক ২ শতাংশ হাইপারথাইরয়েডিজম রোগে ভুগছে। থাইরয়েড গ্রন্থি শরীরের বিপাকীয় ফাংশনের জন্য দায়ী। তাই থাইরয়েডের সমস্যা দেখা দিলে পুরো শরীরে তার প্রভাব পড়ে। একজন থাইরয়েড রোগী বিষন্নতা, ওজন বৃদ্ধি, ক্লান্তি, শরীরের তাপমাত্রা কম, চুল পড়া, দুর্বল আলোর সংবেদনশীলতা ও শক্তির অভাব অনুভব করতে পারেন।
বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটি সাংগঠনিক সম্পাদক এবং বিএসএমএমইউ এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহজাদা সেলিম জানিয়েছেন, হরমোনজনিত এসব সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশে জেনেটিক ইনভেস্টিগেশন প্রয়োজন। প্রায়ই এমন অনেক রোগী আসেন যাদের সন্তানদের বয়স বাড়লেও শারীরিক গঠন বাড়ছে না। এই সমস্যা সমাধানে আরো গবেষণা প্রয়োজন। তবে নারীদের ক্ষেত্রে এখন এই সমস্যা বেশি লক্ষণীয়। নারীদের থাইরয়েড হরমোনজনিত সমস্যা পুরুষদের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি।ডা. শাহজাদা সেলিম আরও বলেন, থাইরয়েড গ্রন্থিটি গলার সামনের দিকের অবস্থিত। গ্রন্থিটি দেখতে প্রজাপতি সাদৃশ এবং এটি ট্রাকিয়া বা শ্বাসনালিকে প্যাঁচিয়ে থাকে। যদিও এটি একটি ছোট গ্রন্থি, কিন্তু এর কার্যকারিতা ব্যাপক। থাইরয়েড গ্রন্থি কর্তৃক নিঃসৃত হরমোন মানব পরিপাক প্রক্রিয়ায় অন্যতম ভূমিকা পালন করে। ভ্রƒণ অবস্থা থেকে আমৃত্যু থাইরয়েড হরমোনের প্রয়োজন অপরিহার্য। এ হরমোনের তারতম্যের জন্য শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি, শরীর মোটা হওয়- ক্ষয় হওয়া, মাসিকের বিভিন্ন সমস্যা, ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা, হার্টের সমস্যা এবং চোখ ভয়ংকরভাবে বড় হয়ে যেতে পারে। বন্ধ্যাত্বের অন্যতম কারণ হিসেবে থাইরয়েড হরমোনের তারতম্যকে দায়ী করা হয়। শারীরিক কার্যক্ষমতা সঠিক রাখার জন্য নির্দিষ্ট মাত্রায় এ হরমোন শরীরে থাকা একান্ত জরুরী।
গর্ভধারণকালে কোন মা যদি থাইরয়েড সমস্যায় থাকে তাহলে মানসিক প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্ম হতে পারে। তাই অন্তঃসত্ত্বা নারীর পাশাপাশি নবজাতকদেরও স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনতে হবে। মেধাবী মানুষের সমাজ নিশ্চিত করতে চাইলে মানুষের শরীরে সঠিক মাত্রায় থাইরয়েড নিশ্চিত করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশে ২ কোটির বেশি মানুষ থাইরয়েড সমস্যায় আক্রান্ত। ওই দেশটিতেও এখনো ৬০ শতাংশ মানুষের থাইরয়েড সমস্যা শনাক্তের বাইরেই রয়েছে। তাই বাংলাদেশের পরিস্থিতি সহজেই অনুমেয়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, থাইরয়েড হরমোনের পরিমাণ স্বাভাবিক থেকেও থাইরয়েড গ্রন্থি ফুলে যেতে পারে। সাধারণত আয়োডিনের অভাবে গলাফুলা রোগ হয়ে থাকে, যাকে আমাদের সাধারণ ভাষায় ঘ্যাগ রোগ বলা হয়। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে আমাদের বেশিরভাগ স্কুলগামী শিশু এবং গর্ভবতী মায়েদের আয়োডিনের অভাব রয়ে গেছে। এ আয়োডিন শরীরে অতি প্রয়োজনীয় থাইরয়েড হরমোন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দুঃখের বিষয় সারা পৃথিবীতে এখনও ২ হাজার মিলিয়ন লোক আয়োডিনের অভাবে ভুগছেন।
বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটি স্বল্প পরিসরে কাজ শুরু করলেও সারাদেশের মানুষকে যুক্ত করে এখনো কোনো গবেষণা হয়নি যে কত মানুষ এই থাইরয়েড সমস্যায় আছে। ভারতের কলকাতায় মোট জনসংখ্যার ২০ থেকে ৩০ শতাংশ থাইরয়েড সমস্যায় আক্রান্ত। যুক্তরাষ্ট্রে এখনো দুই কোটির বেশি মানুষ থাইরয়েড সমস্যায় আক্রান্ত। তারপরও যুক্তরাষ্ট্রে এখনো ৬০ শতাংশ রোগী শনাক্ত হয়নি। বাংলাদেশের সমুদ্র থেকে যত উত্তর দিকে যাওয়া যাবে তত আয়োডিনের পরিমাণ কমতে থাকে। বিশ্বে ৭৭ কোটির বেশি মানুষ থাইরয়েড সমস্যায় আক্রান্ত। এর মধ্যে শুধু চীনেই ১৩ কোটির বেশি মানুষ থাইরয়েড রোগে আক্রান্ত। ভারতে আক্রান্ত ৭ থেকে ৮ কোটি মানুষ।
দিবসটি উপলক্ষে বুধবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাঙ্গণে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করে বাংলাদেশ এন্ড্রোক্রাইন সোসাইটি ও বাংলাদেশ থাইরয়েড সোসাইটি। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মোঃ শারফুদ্দিন আহমেদ থাইরয়েডজনিত সদস্যা মোকাবিলায় সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানসমূহকে ঐক্যবদ্ধভাবে জনসচেতনতামূলক কাজ করার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইাট (বিইএস) প্রতিবারের মতো এ বছরও দিবস উদযাপনে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। দিবসটি উদযাপন উপলক্ষে বিইএস ‘গর্ভাবস্থায় থাইরয়েড রোগ চিকিৎসার গাইডলাইন’ প্রকাশ করা হবে। এছাড়া দিবসটি উদযাপন উপলক্ষে এবারও রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বৈজ্ঞানিক অধিবেশনের’ এবং ‘গর্ভাবস্থায় থাইরয়েড রোগের চিকিৎসার গাইডলাইন’ প্রকাশ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব সাইফুল হাসান বাদল এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ দেশবরেণ্য খ্যাতিমান চিকিৎসকরা অংশগ্রহণ করেন।
বিশ্ব থায়রয়েড দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এসব অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট সকলকে থায়রয়েড রোগ নিয়ে গবেষণায় উদ্যোগী হওয়া, রোগের সঠিক চিকিৎসা প্রদান ও রোগ প্রতিরোধের ব্যাপকভিত্তিক কর্মযজ্ঞে পরিচালনার আহ্বান জানানো হয়।

দয়া করে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর..